মুনাফেকদের সাহাবির মর্যাদা দিতে গিয়ে আমরা নিজের অজান্তেই জঘন্য অপরাধ করে বসছি



আমরা এখন সাহাবার সংজ্ঞা নিয়ে সামান্য আলোচনা করব। সাহাবির প্রকৃত সংজ্ঞা যদি আমরা না জানি তাহলে মুনাফেকদের সাহাবির মর্যাদা দিতে গিয়ে আমরা নিজের অজান্তেই জঘন্য অপরাধ করে বসব। যে সমস্ত মুনাফেক ইসলামের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জবরদখল করে ইসলামের শাশ্বত আদর্শগুলোর কবর রচনা করেছে, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যের ধর্ম ইসলামকে রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, পুঁজিবাদী ও একচেটিয়া ব্যক্তি মালিকানার লেবাস পরিয়ে কলুষিত করেছে; তাদেরকে, তাদেরই এক শ্রেণীর ভাড়াটে মোল্লা কর্তৃক 'সাহাবা', তাদের অপকর্মগুলোকে 'ইজতেহাদ'-এর নাম দিয়ে চৌদ্দশত বৎছর উম্মতে মুহাম্মদি (সাঃ)-কে এক জঘন্য ধোঁকার মধ্যে রাখা হয়েছে। সত্য যাতে উন্মোচিত হতে না পারে তার জন্য তাদের সমালোচনাকারীকে 'হাবিয়া' নামক জুজুর ভয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু মানুষ এখন আগের মতো অশিক্ষিত ও বোকা নেই। ফতোয়াবাজির বাণ মেরে মানুষকে আর জব্দ করা যাবে না। আগে শিক্ষার অভাবে ধর্মীয় বিষয়ে জানার জন্য তথাকথিত মোল্লাদের নিকট ধর্না দিতে হতো। এখন পৃথিবীর সব কটি ভাষায় ধর্মীয় সাহিত্য অনূদিত হয়েছে। বিজ্ঞানের আলোকে ধর্মীয় বিষয়গুলোকে গবেষণা করা হচ্ছে। সুতরাং ভয় নেই। আল্লাহর শোকর, আমাদেরকে আর তথাকথিত মোল্লাদের কাছে ধর্না দিতে হয় না। এখন আমরা কোরআন-হাদিস ও অলি-আল্লাহদের মতামতের ভিত্তিতে 'সাহাবা' শব্দের অর্থ অনুধাবন করার চেষ্টা করব।
আমরা পূর্বেই পবিত্র কোরআনের সূরা হুজারাতের ১৪-১৫, সূরা আনকবুতের ২-৩, সূরা হাদিদের ১০ ও সূরা মায়েদার ৪৪-৪৭ নং আয়াতের পর্যালোচনা করে প্রমাণ করেছি যে, প্রকৃতপক্ষে সাহাবি তাঁরাই যাঁরা ইসলামের আদর্শে উদ্বুদ্ধ ও প্রিয় নবীজি (সাঃ)-এর মহব্বতে ইমান এনেছেন এবং সে অনুযায়ী জীবনব্যবস্থা পরিচালিত করেছেন। যে সমস্ত খলিফা বা রাষ্ট্রনায়ক কোরআনের বিধানানুযায়ী শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেছেন এবং যারা ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে স্বীয় জান ও মাল দিয়ে ইসলামের খেদমত করেছেন তাঁরাই প্রকৃতপক্ষে নবীজি (সাঃ)-এর সাহাবা। মক্কা বিজয়ের পর যারা জান বাঁচানোর তাগিদে এবং গনিমতের মাল ভক্ষণের নিয়তে সর্বোপরি ইসলামের মহান আদর্শগুলোর বারোটা বাজানোর উদ্দেশ্যে মুসলমান সেজেছে তারা কোরআন ও হাদিসের ভাষায় মুনাফেক। আল্লাহর কোরআন এ কথা সাক্ষ্য দেয় যে, “আনুগত্য স্বীকার করা আর ইমান আনা এক কথা নয়।” [সূরা হুজুরাত : ১৪-১৫।]
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিচ্ছেন, 'যারা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য ইলাহ্ গ্রহণ করে এবং মনে করে যে, ওই সমস্ত ইলাহ্ তাদের ইহজীবনে সুখ-শান্তির কারণ হবে অর্থাৎ যারা আল্লাহ্ ছাড়া পার্থিব বিষয়বস্তুর উপর সুখ-শান্তির জন্য নির্ভর করে, তারা মুখে আল্লাহর প্রতি ইমানের ঘোষণা করলেও প্রকৃতপক্ষে তারা ইমানদার নয়।
কোরআনের আয়াত, “তাহারা আল্লাহ্ ছাড়াও অন্যান্য ইলাহ্ গ্রহণ করে যেন ইহারা (ইলাহসমূহ) তাদের জন্য শাস্তি ও সম্মানদাতা হয়। [সূরা মরিয়ম : ৮১।]
(উক্ত আয়াতে অন্যান্য ইলাহ্ বলতে লোভ-লালসার বশীভূত হয়ে পার্থিব বিষয়বস্তুর উপর নির্ভর করাকে বোঝানো হয়েছে)
প্রসঙ্গক্রমে এখানে একটি কথা উল্লেখ করতে চাই যে, 'সাহাবা' শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সঙ্গী বা সাথী। এ অর্থে পবিত্র কোরআন ও হাদিস শরিফে 'সাহাবা' শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। কোরআন ও হাদিস শরীফে ব্যবহৃত 'সাহাবা' শব্দের অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্ ও রাসূল (সাঃ)-এর উপর ইমান আনয়নকারী, অনুগত ও অনুসারী। সুতরাং সকল সাহাবা উম্মতে মুহাম্মদি (সাঃ)। গোলামি এখতেয়ার করা ছাড়া 'উম্মত' হওয়া যায় না (৪;৮০, ৩;৩১-৩২)। গোলাম তাকেই বলে যে মুনিবের সকল আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে বাধ্য। সে হিসেবে সকল সাহাবা আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-এর গোলাম। একটি উদাহরণ দিয়ে বলা যায়-
হজরত ওমর (রাঃ)-এর শাসনামলে ইমাম হোসাইন (রাঃ) ও ইবনে ওমররর মধ্যে কোনো বিষয়ে বচসা হলো। ইমাম হোসাইন ইবনে ওমরকে 'আমার নানার গোলামের বাচ্চা' সম্বোধন করে কষে একটা চড় বসিয়ে দিলেন। এতে ইবনে ওমর ক্রোধান্বিত হয়ে স্বীয় পিতা খলিফা হজরত ওমর (রাঃ)-এর নিকট অভিযোগ উত্থাপন করলেন। হজরত ওমর (রাঃ) পুত্রের অভিযোগ শুনে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'সত্যিই কী তিনি তা বলেছেন?’ ইবনে ওমর বললেন তিনি সত্যিই এ কথা বলেছেন, প্রয়োজনে সাক্ষীও উপস্থাপন করতে পারবেন। অতঃপর হজরত ওমর (রাঃ) স্বীয় পুত্রকে সাথে নিয়ে ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর নিকট গমন করলেন এবং তিনি সবিনয়ে জানতে চাইলেন, আসলেই ইমাম হোসাইন (রাঃ) এ কথা বলেছেন কি না ? ইমাম হোসাইন (রাঃ) বললেন, 'হ্যাঁ, আমি বলেছি।' হজরত ওমর (রাঃ) বললেন, 'আপনি পুনরায় বলুন, আমি আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই।' ইমাম হোসাইন (রাঃ) পুনরায় ইবনে ওমরকে লক্ষ্য করে বলেন, 'হে ইবনে ওমর, তুই আমার নানাজানের গোলামের বাচ্চা গোলাম।' এ কথা শুনে হজরত ওমর (রাঃ) যারপরনাই আনন্দিত হলেন এবং পুনরায় ইমাম হোসাইন (রাঃ)-কে অনুরোধ করলেন, 'দয়া করে আপনি যদি এ কথাটি কাগজে লিখে দেন।' অতঃপর ইমাম হোসাইন (রাঃ) তাঁর এ বক্তব্যটি একটি কাগজে লিখে দেন। হজরত ওমর (রাঃ) এ লেখাটি অতি যত্নসহকারে সংরক্ষণ করেন এবং তাঁর আওলাদদের অসিয়ত করে যান যে, মৃত্যু অন্তে কবরে এই সনদপত্রটি যেন তাঁর বুকে রেখে তাঁকে কবর দেয়া হয়, যাতে তিনি রোজ হাশরে আল্লাহর সামনে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর গোলাম হিসেবে, ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর দেওয়া এই সার্টিফিকেটটি তাঁর নাজাতের দলিল হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন।
[সিহাহ সিত্তাহর হাদিস গ্রন্থ থেকে অনেক ইতিহাসের কিতাবে এ ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে।]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ