
মহান স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালা আপন পরিচয় প্রকাশের জন্য । সৃষ্টিজগৎ সৃজন করেছেন, সুন্দর ও সুনিপুণ বিশ্ব জাহান সৃজনের পর তিনি মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত বা সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মর্যাদা দিয়ে এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন । পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে , “ লাকাদ কাররামনা বানি আদাম “ নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি, মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের মর্যাদার বর্ণনা দিতে গিয়ে পবিত্র কোরআনে আরাে এরশাদ করেছেন , “ হুয়াল্লাজি খালাকা লাকুম মা ফিল আরদে জামিআ ” তিনি ( আল্লাহ ) পৃথিবীর সবকিছু তােমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন ” ( সূরা - আল্ বাকারা , ২ : ২৯ ) । এখন প্রশ্ন জাগে , কেন আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এত মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন ? তিনি যে কোন কিছু উদ্দেশ্য বিহীনভাবে তৈরী করেন না , সে সম্পর্কে পবিত্র কোরআনেই তাে এরশাদ হয়েছে , “ ওয়ামা খালাকনাছ ছামাওয়াতি ওয়াল আরদা ওয়ামা বাইনাহুমা ইল্লা বিল হাক্কি ” - “ আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী এবং তন্মধ্যস্থিত কোন কিছুই আমি অযথা সৃষ্টি করি নাই ” ( সূরা আল হিজর , ১ : ৮৫ ) । তাহলে মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি ? মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে অতি প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন জ্ঞানী - গুণী , সাধকগণ ভিন্ন ভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন । কেউ বলেছেন , মানুষকে একটি সুন্দর ও শান্তিময় সমাজ গড়ে । তােলার উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন । কেউ বলেন , এ পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ধরে রাখার জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা । হয়েছে । কেউ বলেন , মানুষকে আনন্দ ফুর্তিতে জীবন অতিবাহিত করার জন্য । সৃষ্টি করা হয়েছে । কেউ বলেন , মানুষকে আল্লাহ খেলা করার জন্য সৃষ্টি করেছেন । | আবার কেউ বলেন , মানুষকে আল্লাহ স্বীয় পরিচয় প্রকাশের জন্য সৃজন করেছেন । এমনি বহুবিধ ধারণা সাধারণ মানুষকে অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত করে জীবনের সঠিক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ঠিক করতে না পেরে মানুষ স্বেচ্ছাচারিতায় লিপ্ত হয়ে আপন ভােগ - বিলাসিতা , দম্ভ - আমিত্ব বিকাশের প্রচেষ্টায় নিয়ােজিত হয় এরই ফলশ্রুতিতে পৃথিবীময় চরম অরাজকতা ও অশান্তির সৃষ্টি হয়েছে । প্রকৃতপক্ষে , মানুষ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য কি ? তা বিশেষণ করতে গেলে প্রথমেই মানুষের দায়িত্ব ও মর্যাদা বিবেচনা করা প্রয়ােজন । পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন , “ ইন্না আরাধনাল আমানাতা আলাছ ছামাওয়াতি ওয়াল আরদি ওয়াল জিৰালি ফা আইন আইয়্যাহ মিলনাহা ওয়া আশফাকনা মিনহা ওয়া হামালাহাল ইনছান ” আমি তাে নভােমন্ডল , ভূমন্ডল ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত পেশ করেছিলাম , তারা তা বহন করতে অস্বীকার করলাে এবং তাতে শংকিত হলাে , কিন্তু মানুষ তা বহন করলাে ” ( সূরা আল আহযাব , ৩৩ : ৭২ ) । অর্থাৎ একমাত্র মানুষই আল্লাহকে ধারণ করতে সম্মত হয়েছিল । আর সমস্ত সৃষ্টিরাজী আল্লাহকে ধারণ করার ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে অস্বীকার করেছিল । এমতাবস্থায় আল্লাহ তায়ালা স্বীয় রূহকে মানুষের মাঝে ফুকে দিয়ে | মানুষকে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করেন । মানুষকে তিনি তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধির মর্যাদা দান করলেন । পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে , “ ইন্নি জায়্যিলুন ফিল আরদে খালিফা ” - “ নিশ্চয়ই পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি প্রেরণ করবে ” | আল্লাহর প্রতিনিধি এ মানুষকে সুদৃঢ় ও শান্তিময় সমাজ গড়ে তােলার জন্য পাঠানাে হয়নি । কারণ দুনিয়া মানুষের জন্য চিরস্থায়ী আবাস নয় । এটা সাময়িক পরীক্ষা ক্ষেত্র মাত্র । আল্লাহ মানুষকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখার জন্য প্রেরণ করেননি । এ জন্য আল্লাহর অসংখ্য ফেরেশতা রয়েছে । আল্লাহ মানুষকে আনন্দ - ফুর্তিতে মত্ত থাকতে পাঠাননি, কারণ এর মাধ্যমে মানব জীবন কলুষিত হয় । আর আল্লাহ মানুষকে খেলার জন্য সৃষ্টি করেননি কারণ আল্লাহ যে কোন কিছুকে খেলার জন্য সৃষ্টি করেননি এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে , “ ওয়ামা খালাক নাছ ছামাআ ওয়াল আরদা ওয়ামা বাইনাহুমা লায়্যিবীন “ নভােমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং তন্মধ্যস্থিত কোন বস্তু আমি ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করি নাই ” ( সূরা - আল আম্বিয়া | | সুতরাং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেৰে | | মানুষকে সৃষ্টি করেছেন বিশ্ব জাহানে স্বীয় | পরিচয় তুলে ধরার জন্য আল্লাহ্ যে মহান স্রষ্টা , প্রতিপালক , সকল কিছুর মালিক ও কর্ম বিধায়ক এ সত্য সবার কাছে প্রচারের জন্যই মানুষকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন । তাই দেখা যায় , পৃথিবীতে আগত সমস্ত নবী - রাসূল মানুষের কাছে তাওহীদের তথা একত্ববাদের বাণী অর্থাৎ আল্লাহ যে মহান । স্রষ্টা ও প্রতিপালক এ কথা প্রচার করেছেন । তারা মানুষকে বুঝাতে চেয়েছেন , আল্লাহই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী । তাঁকে আঁকড়ে ধরে থাকলে মানুষের জন্য কল্যাণ । অন্যথায় মানব জীবন কলুষিত হয় । কাজেই মহান আল্লাহ তায়ালার মহা সত্য ও পরিচয় তুলে ধরার জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে । আমরা যদি তা পালন করতে সমর্থ হই , তবেই আমাদের জীবন হবে শান্তিময় । তবে এ কথা সত্য যে , মানবকুলে জন্ম নিলেই খাটি মানুষ তথা ইনসানে কামেল হওয়া যায় না । এজন্য খাটি অলী - আল্লাহর সােহবতে গিয়ে, এলমে তাসাউফের সাধনা করে প্রথমতঃ = আল্লাহর পরিচয় লাভ করতে হয় । যুগে যুগে সমস্ত নবী - রাসূল প্রত্যেকেই প্রথমে সাধনার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে যােগাযােগ স্থাপন করেছেন । এরপর আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী কাজ করেছেন । অনুরূপভাবে বেলায়েতের যুগের । মানুষকেও আল্লাহর সাথে যােগাযােগ স্থাপনের পর আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী জীবন পরিচালনা করে তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব তুলে, ধরতে হয় । তখনই একজন মানুষ, ইনসানে কামেল বা খাটি মানুষে পরিণত, হয়ে আল্লাহর প্রতিনিধি হতে পারেন।
0 মন্তব্যসমূহ