শরীয়ত, তরীকত এবং সকল প্রকার তালিম ফয়েজের উৎস হচ্ছেন হযরত মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুকরণীয় ব্যাক্তিত্ব।
খোলাফায়ে রাশেদীন অর্থাৎ হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ), হযরত ওমর ফারুক (রাঃ), হযরত ওসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), এনাদের মধ্যে প্রত্যেকেই হুজুর পাক সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতময় বেহেশতী সোহবত থেকে ইবাদত বন্দেগী ও আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষনের পদ্ধতি বা তরীকা শিক্ষা করেছেন এবং আত্মিক কল্যান লাভ করেছেন। এই পদ্ধতি গুলো চারজন খলিফার মাধ্যমেই পৃথিবীব্যাপী বিস্তৃতি লাভ করে। সময়ের ব্যাবধানে যিনি যে তরীকার যত অধিক অনুসারী তৈরী করেছেন, সেই তরীকাহ তার নামেই পরিচিতি লাভ করেছে এবং এভাবে তরীকাহ গুলো নির্দিষ্ট নামে সুপরিচিত হয়েছে।
উদাহরণ, চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ) এর আধ্যাত্মিক শিক্ষা পুনরায় গাউসুল আজম বড় পীর ছাহেব হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) এর মাধ্যমে প্রসারিত হলে তা তাঁরই নামানুসারে কাদেরিয়া তরীকাহ নামে পরিচিত হয়।
অপর একটি শাখা এভাবেই খাজা মইনুদ্দিন চিশতী আজমীরী (রহঃ) এর নামে চিশতিয়া তরীকা নামে পরিচিত হয়েছে।
তেমনি ভাবে তৃতীয় একটি ধারা শাইখ শিহাবুদ্দিনন সোহরাওয়ারদী (রহঃ) এর মাধ্যমে বিস্তৃত হওয়ায় তা সোহরাওয়ারদীয়া তরীকাহ নামে খ্যাত।
ঠিক একই কায়দায়, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) এর প্রভাবাদিন কিছু আধ্যাত্মিক শিক্ষা ধারা সাত জন বড় আউলিয়ার মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে যা তরীকায়ে খাজেগান নামে পরিচিত হয়। এই সাত ব্যাক্তির আধ্যাত্মিক মর্যাদা এতই সুউচ্চ যে, সকল পীর আউলয়াগণ তাঁদের নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছেন।খাজা শব্দের আভিধানিক অর্থ কোন নেতাকে বোঝায়। সপ্ত খাজেগানের মধ্যে সর্বপ্রথম ব্যাক্তিত্ব হচ্ছে হযরত খাজা আব্দুল খালেক গিজদাওয়ানী (রহঃ) এবং সর্বশেষ হচ্ছেন, খাজা বাহাউদ্দিন নখশবন্দ বুখারী (রহঃ) ।
এই পর্যন্ত এই তরীকাটি খাজেগান তরীকা নামে পরিচিত ছিল।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) এর সাথে সম্পর্কিত এই তরীকাহ হযরত বাহাউদ্দিন নখশবন্দী বুখারী (রহঃ) এর সময় উন্নতির সর্বোচ্চ সীমায় পৌছায় এবং আল্লাহ্ পাক এই তরীকাহ কে বিশেষ জনপ্রিয়তা দান করেন। খাজা নখশবন্দী (রহঃ) এই তরীকাহটিকে যথাযথ পদ্ধতিতে সুবিন্যস্ত ও সুসংগঠিত করেন। এবং তাঁর মাধ্যমে এই তরীকাহ আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করে। খাজা নখশবন্দী (রহঃ) এর পর থেকে এই তরীকা তাঁরই নামানুসারে নখশবন্দীয়া তরীকাহ নামে পরিচিত হয়।
এই তরীকার ইতিহাস:
নখশবন্দীয়া (নখশাবন্দীয়া) তাসাওউফের প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত একটি তরিকা। খাজা বাহাউদ্দীন ইবনে আহমদ আল-বুখারী (র.) এর প্রতিষ্ঠাতা। ‘নখশবন্দ’ শব্দের অর্থ ‘চিত্রকর’; এ তরিকার সূফীরা আল্লাহর মহিমার চিত্র হূদয়ে ধারণ করেন এ অর্থে তাঁদের বলা হয় নক্শবন্দী। ️কথিত আছে বাহাউদ্দিন নখশবন্দী রহঃ কারো সিনায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে সেখানে আল্লাহ নামের নকশা হয়ে জিকির জারি হয়ে যেতো। এবং কোথাও হাত দিয়ে আল্লাহ নামের নকশা লিখে দিলে তা হতে অনবরত জিকির জারি হয়ে যেতো। আজ অবদি এই ছেলছেলার বুজুর্গ গনদের ইশারায় পাপী বান্দার পাপের বাসনা মুছে গিয়ে ঐ হৃদয়ে আল্লাহ নামের নকশা অংকিত হয়ে সেখানে আল্লাহ নামের জিকির জারি হয়ে যায়।
সাধনা ও মুক্তিকামীদের সনদ:-
এই তরীকার ইমাম হযরত খাজা বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নখশবন্দী বোখারী (রহঃ) কে মারেফাতুল্লাহ হাছিল করার জন্য কঠোর সাধনা করতে হয়েছিল। রিয়াজত ও মুশাক্কাত ছাড়াও তদানিন্তন বোখারার সমস্ত খানকাহ ও মাদ্রাসার প্রয়োজন অনুসারে পানি সরবরাহ, দরবেশ গনের খেদমত, এমন কি পায়খানা পর্যন্ত সাফ করে - এক কথায় সমস্ত প্রকারের মুশাক্কাত ও মোজাহেদার পরে তিনি ফকিরি হাছিল করেছিলেন।
নফস ও বাতেনী তাজকিয়া তাফসিয়ার জন্য হযরত এইভাবে চল্লিশ পঞ্চাশ বছর কঠোর পরিশ্রমের পরে চিন্তা করলেন, পরবর্তী যমানার মানুষের হায়াত এতো দীর্ঘ হবে না এবং আল্লাহ্ তায়ালার মোহাব্বত ও মারেফাত হাছিলের জন্য তারা এতো কস্ট করতে পারবে না। সুতরাং আমি যেভাবে মারেফাতুল্লাহ হাছিল করেছি, যদি এই নিয়ম ই বজায় থাকে, তাহলে মারেফাতুল্লাহ হাছিল করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে। কারন যতই দিন যাবে মানুষ দুনিয়ার ঝামেলায় ততই অধিক পরিমানে জড়িত হয়ে পড়বে।
দীর্ঘ দিন চিন্তা ভাবনার পরে হযরত একটি সহজ তরীকা ভিক্ষা চেয়ে মহান আল্লাহর দরবারে একাদিক্রমে পনের দিন পর্যন্ত কান্নারত অবস্থায় সিজদায় পড়ে থাকলেন। কেবল মাত্র নামাজের সময় জামাতে নামাজ পড়তেন। বাকি সময় সেজদায় থাকতেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি কোন ওয়াক্তে এক লোকমা খানা বা এক বিন্দু পানি স্পর্শ করেন নাই।
হযরতের আবেদন ছিল, " ইয়া আল্লাহ আপনি আমাকে এমন তরীকা দান করুন, যেই তরীকায় খুব সহজেই মারেফাতুল্লাহ হাছিল হয় এবং তালেবে মাওলা যেন মাহরুম না থাকে। " অর্থ্যাৎ আল্লাহর দীদার যেন হাসিল করতে পারে।
এইভাবে পঞ্চদশ দিবসে মহান আল্লাহ্ পাকের তরফ থেকে ইলহাম হল, " আপনাকে আমি এমন তরীকা দান করব, যেই তরীকায় দাখিল হইবার পরে কেউ আল্লাহর রহমত হতে মাহরুম (বঞ্চিত) থাকিবেনা। " নাজাতপ্রাপ্ত ব্যাক্তিগনই সামিল হইবে। পরবর্তীতে উনাকে নখশবন্দিয়া তরিকার ইমামত তাকে দান করা হয়।
ভারতে দ্বিতীয় সহস্রাব্দীর মোজাদ্দেদ, ইমামে রব্বানী, শাইখ আহমদ ফারুকী সেরহেন্দী (রহঃ) এর আবির্ভাব হলে এই তরীকাহ খাজা বাকী বিল্লাহ (রহঃ) এর মাধ্যমে তাঁর নিকট এই আমানত পৌঁছে এবং তিঁনি এই তরিকার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করেন। এই তরীকার মাধ্যমেই আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। তাই হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানী ( রহঃ) এর পর থেকে তরীকাটি নখশেবন্দিয়া মোজাদ্দেদিয়া নামে অভিহিত হয়। পরবর্তী তে এই তরীকাটি নখশবন্দিয়া - মুজাদ্দেদিয়া তরীকা নামে ব্যাপক ভাবে পরিচিত হয়।
তথ্যসূত্রঃ নূরে মারেফাত, ৫৬-৫৭ পৃষ্ঠা
ছবিঃ - ইমামত তরিকত, শামসুল আরেফিন সাইয়্যেদ হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নখশাবন্দী (রঃ) এর রওজা শরীফ, বোখারা, উজবেকিস্থান।
0 মন্তব্যসমূহ