১০ ই মুহররম ইমাম হুসাইন (আ:) শেষ ভাষণ



#কারবালা_ময়দানে এজিদ বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইমাম হুসাইন (আ:) শেষবারের মতো যে ভাষণটি দিয়েছিলেন

"তোমরা আমাকে চেন না? চেয়ে দেখ, আমি কে?

আমি রাসুল (সা:) এর প্রিয়তম দৌহিত্র, আমি খাইবার বিজয়ী শেরে খোদা, #হযরত_আলী (আ:) এর ছেলে, আমি খাতুনে জান্নাত মা #ফতেমাতুজ্জোহরার স্নেহের লাল। তোমরা কি জাননা যে, আমার নানা ছিলেন রাসুলে খোদা (সা:)? তোমরা কি জাননা, আমার মা খাতুনে জান্নাত, হযরত ফাতেমা জাহরা (আ:) হলেন মোহাম্মদ মোস্তফা (সা:) এর কন্যা? তোমাদের কি জানা নেই, আমার পিতা হলেন আমিরুল মুমিনীন শেরে খোদা আলী (আ:)?

তোমরা কি জানো, #রাসুলে_খোদার_পবিত্র_তরবারী আমার হাতে রয়েছে? তোমরা কি জানো, আমার মাথার এ #পাগড়িটি_মহানবী (সা:) এর? তোমারা কি ভুলে গেছো, আমি এবং আমার ভাই - আমারা দু'জন #জান্নাতের_যুবকদের_সর্দার? তোমরা কি নানাজানের মুখে শোন নি, আমি আমার ভাই হাসান বেহেস্তের সরদার?

পাষণ্ড এজিদ বাহিনীর পক্ষ থেকে উত্তর আসে “হে! হুসাইন ইবনে আলী, আমরা এ সবই জানি”

#জবাবে_হুসাইন (আ:) বলেন, "তারপরও আমার রক্ত তোমরা কি করে হালাল মনে করছো?"

এমন প্রশ্নে কিছুক্ষণের জন্য খামোশ হয়ে যায় এজিদ বাহিনী।

এর একটু পরেই এজিদের নির্দেশে, তার এক সেনাপতির কাছ থেকে আসে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় #প্রহসনের_ঘোষণা -
"নামাজের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাচ্ছে...হুসাইনকে তাড়াতাড়ি কতল কর"।

#সম্পূর্ন_একাকী_অবস্থায় কারবালা প্রান্তরে তখন শাহাদাতের অপেক্ষায় আছেন ইমাম হোসেন (আ:) এবং ওঁনার অসুস্থ পুত্র #৪র্থ_ইমাম_জয়নুল_আবেদীন (আ:) ।

পড়ন্ত বিকালে কারবালার প্রান্তরে
একে একে ৭১ জন শহীদ হয়ে গেছেন। এরমধ্যে তাঁর ছয় মাসের শিশু আলী আসগরের (আঃ) লাশও ছিল। যখন ইমাম হোসেন (আঃ) তাবুর বাচ্চা এবং নারীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কারবালার ময়দানে আসেন এবং পুনরায় সবাইকে হযরত আলী (আঃ) এর যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
পড়ন্ত বিকেলে, রাসূলুল্লাহ (আ:) এর প্রান প্রিয় আদরের নাতি এবং মহান অাল্লাহ কতৃক নির্বাচিত তৃতীয় ইমাম, হোসাইন (আ:) তাঁর চর্তুদিক দিকে ঘিরে থাকা ঈয়াযীদী বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে জীবনের শেষ কতগুলো কথা বলেন --

"হে শীয়ানে মূয়াবীয়া !!
বিবেচনা কর, আমার পরিবার সম্পর্কে এবং গভীরভাবে ভাবো, আমি কে?, এরপর নিজেদের তিরস্কার কর। তোমরা কি মনে কর আমাকে হত্যা করা এবং আমার পবিত্রতা ও সম্মাান লুট করা তোমাদের জন্য বৈধ?

#আমি_কি_তোমাদের_নবীজী (সাঃ) এর নাতি, তার ওয়াসী ও তার চাচাত ভাইয়ের সন্তান নই? যিনি ছিলেন বিশ্বাস গ্রহনে সবার আগে এবং সাক্ষী ছিলেন সে সব কিছুর উপরে যা নবী (সাঃ) আল্লাহর কাছ থেকে এনেছেন। শহীদদের সর্দার হামযা (রাঃ) কি আমার পিতার চাচা ছিলেন না?
জাফর (রাঃ), যিনি বেহেশতে দু পাখা নিয়ে ওড়েন, তিনি কি আমার চাচা নন? নবী (সাঃ) এর হাদিস কি তোমাদের কাছে পৌছে নি যেখানে তিনি আমার সম্পর্কে ও আমার ভাই সম্পর্কে বলেছেন যে, আমরা #দুজন_জান্নাতের_যুবকদের_সর্দার? তাই যদি আমি যা বলছি তার সাথে একমত হও, এবং নিশ্চয়ই আমি যা বলেছি তা সত্য ছাড়া কিছু নয়। তাহলে তা উত্তম , কারন আল্লাহর শপথ, যে সময় থেকে আমি বুঝেছি যে আল্লাহ মিথ্যাবাদীদের অপছন্দ করেন তখন থেকে আমি কখনই মিথ্যা বলিনি।

আর যদি তোমরা আমি যা বলেছি তা বিশ্বাস না কর তাহলে তোমাদের মাঝে এখনও নবীর জীবিত সাহাবাগন আছে, তাদের কাছে যাও এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর এবং তারা আমার বক্তব্যের সত্যতার সাক্ষী দিবে ।

জাবির বিন আবদুল্লাহ আনসারি, আবু সাঈদ খুদরি, সাহল বিন সাদ সায়েদি, যায়েদ বিন আরকাম এবং আনাস বিন মালিককে জিজ্ঞেস কর, তারা তোমাদের বলবে যে, তারা আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এর কাছ থেকে আমার ও আমার ভাই সম্পর্কে এই হাদিস শুনেছে। এটি কি তোমাদের জন্য আমার রক্ত ঝরানোর চাইতে যথেষ্ট নয়?"

তখন অভিশপ্ত শীমার বিন যিলজাওশান বলল, "আমি আল্লাহর ইবাদত করি ঠোট দিয়ে এবং তুমি যা বলছো তা আমি বুঝি না"।
এ কথা শুনে #ইমাম_হুসাইন (আঃ) বললেন, "আমি দেখছি তুমি সত্তুর ধরনের সন্দেহ নিয়ে আল্লাহর ইবাদত কর এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি সত্য বলেছ, তুমি ইমাম যা বলেছেন তা বুঝতে পার নি কারন তোমার অন্তরে মোহর (মূর্খতার) মারা হয়েছে"।

এবার কুফা থেকে যারা ইমাম হোসাইন (আ:) কে চিঠি লিখে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল তাদের কয়েকজনের নাম ধরে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন -

"হে শাবস ইবনে রাবয়ী !
হে হাযর ইবনে আবযার !
হে কায়েস বিন আশআস !
হে ইয়াযিদ ইবনে হারেস !
হে যায়েদ ইবনে হারেস !
হে আমর ইবনে হাজ্জাজ !

তোমরা কি চিঠি লিখে আমাকে আমন্ত্রণ জানাও নি?

তোমরা কি আমাকে কুফায় আসার জন্য বার বার চিঠি লিখে অনুরোধ কর নি? চিঠিতে লিখ নি, ফল পেকেছে এবং আশেপাশের ভূমিতে ফুল ফুটেছে এবং একটি বিশাল সেনাবাহিনীর কাছে আসুন, যা আমার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে?
তোমরা কি চিঠিপত্র ও দূত পাঠিয়ে বল নি যে, আমাদের কোন ইমাম নেই, আপনি আমাদের মাঝে তাশরীফ আনুন এবং আপনার মাধ্যমেই আল্লাহ হয়তো আমাদের সঠিক নির্দেশনা দিবেন ।
তোমরা এও লিখেছিলে যে, যাদের অধিকার না থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতা দাবী করে ও অন্যায় আচরণ করে, তাদের চাইতে ইসলামী শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে আহলে বাইত ই অধিকযোগ্য বেশি হক্বদার।"

ইবনে সা’দের সৈন্যবাহিনী এবারও নিরব নিথর। হঠাৎ নির্দিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ (যাদের নাম ধরে ধরে ইমাম পাক উপরের কথা বললেন) বলে উঠল- না ! না ! আমরা কোন চিঠিপত্র লিখিনি। মিথ্যা সবই মিথ্যা কথা আমরা এ সম্পর্কে কিছুই জানি না। পূনরায় ইমাম পাক বললেন- ছি: ছি : (ধিক)!! তোমাদের। বড়ই ল অনুতাপ ও পরিতাপের বিষয়। এই চেয়ে দেখো তোমাদের চিঠি। এই তোমাদের স্বাক্ষরযুক্ত আবেদনপত্র। খোদার কসম!! এগুলো তোমরাই লিখেছো এবং লোক মারফত আমার নিকট প্রেরণ করেছো।

ঐ বেহায়া লম্পট মিথ্যুকের দল বলল- যদি লিখে থাকি তাহলে ভালো কাজ করেছি।

মজলুম ইমাম পাক বলল- এখন আমার আগমন যদি তোমাদের মন:পূত না হয়, তোমরা যদি আমাকে না চাও, তাহলে আমাকে ফিরে যেতে দাও। আমি যেখান থেকে এসেছি সেখানেই ফিরে যাব। তোমাদের সাথে আমার কোন বিরোধ ও বিদ্বেষ নাই।

তখন ক্বায়েস বিন আশআস বলল, "তুমি যা বলছ তা আমরা জানি না, আমার চাচাতো ভাইদের (বনি উমাইয়ার) কাছে আত্মসমর্পন কর, তারা তোমার সাথে সেভাবে আচরন করবে যেভাবে তুমি চাও"।
ইমাম (আঃ) বললেন , "আল্লাহর শপথ , নিকৃষ্ট মানুষের মত আমি তোমাদের হাতে হাত দিব না, না আমি পালিয়ে যাব কোন দাসের মত"।

এরপর #ইমাম_হোসেন (আঃ) উচ্চকন্ঠে বললেন ,

"যদি তোমরা এতে সন্দেহ পোষন কর, তোমরা কি এতেও সন্দেহ কর যে আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নাতি?
আল্লাহর শপথ, পূর্বে ও পশ্চিমে, #আমি_ছাড়া_নবী (সাঃ) এর কোন নাতি নেই তোমাদের মধ্যে অথবা অন্যদের মধ্যে। দুর্ভোগ তোমাদের জন্য, আমি কি তোমাদের মধ্যে থেকে কাউকে হত্যা করেছি যে তোমরা তার প্রতিশোধ নিতে চাও?
আমি কি কারও সম্পদ বেদখল করেছি অথবা কাউকে আহত করেছি যার প্রতিশোধ তোমরা আমার উপর নিতে চাও?"
ঈয়াযীদের বিশাল সৈন্য বাহিনী বোবার মত দাড়িয়ে রইল।
তিনি আরও বলেন,
“কেন আমাকে হত্যা করতে চাও?
আমি কি কোন পাপ অথবা অপরাধ করেছি? ”
ঈয়াযীদ বাহিনীর যখন কেউ তাকে উত্তর দিল না।

পুনরায় ইমাম হোসাইন (আঃ) বললেন ,
“আমাকে হত্যা করলে আল্লাহর কাছে কি জবাব দেবে?
কি জবাব দেবে বিচার দিবসে মহানবীর (সাঃ) কাছে? ”

ঈয়াযীদের সৈন্য বাহিনী তখনও পাথরের মত দাড়িয়ে আছে।

#তারপর_যে_গুরুত্বপূর্ণ_কথাটি_তিনি_বলেছিলেন-

পুনরায় #ইমাম_হোসাইন (আ:) বললেন,
"হাল্ মিন্ নাস্রিন ইয়ানসুরুনা?”
"#আমাদের_সাহায্য_করার_মত_কি_তোমাদের_মাঝে_একজনও_নাই?"

#তারপরের_আহবানটি_সাংঘাতিক_মারাত্বক !

ঐতিহাসিকদের মতে এটাই ইমাম হোসাইন (আ:) #শেষ_আহবান ছিল।

“আলাম্ তাস্মাও? ... আলাইসা ফিকুম্ মুসলিমু? ”
"আমার কথা কি শুনতে পাও না? ...
#তোমাদের_মাঝে_কি_মাত্র_একজন_মুসলমানও_নাই?"

তথাকথিত নামধারী মুসলমানের এই অপদার্থের দল এই পবিত্র আত্মার কথার কোন জবাব দিতে পারল না।
সমস্ত কারবালা নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কুলাঙ্গার ঈয়াযীদের বিশাল সৈন্যবাহিনী বোবার মত দাঁড়িয়ে রইল। পাষাণ হৃদয়গুলোতে কোন ভাবান্তর হলো না।

এরপর শত্রুবাহিনী তীর ছুড়ে তার জবাব দিল। শেরে খোদার সন্তান মহাবীর হুসাইন (আঃ) স্থির থাকতে পারলেন না। আমার মৃত্যু ব্যতীত যদি মোহাম্মদের ধর্ম টিকে না থাকে তাহলে হে তরবারী আমাকে গ্রহণ কর। একথা বলে প্রচন্ড হুংকারে তিনি শত্রুদের দিকে ছুটে গেলেন।

সূত্র -
ইবনে আসীর, ৪খন্ড, পৃ. ২৫ / ত্বাবারী, ৬খন্ড, পৃ. ২৪৩ / হাসান ও হুসাইনের কারবালার কাহিনী ও এজিদ বধ পর্ব, পৃষ্ঠা-৬৭-৭০ / দুই ইমাম দুই ফুল, পৃ. ১২৩-১২৫ / শামে কারবালা, পৃ. ১২৫-১২৭ / আহলে বাইত ও কারবালা, পৃ. ৪৪-৪৫ / কিতাবুল ইরশাদ : শেখ মুফিদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৯৭ / মাকতালুল হুসাইন : খারাযমী, ২য় খন্ড, পৃ. ৬ ।

ইমাম হোসেন (আ:) স্বয়ং নিজেই তাঁর জীবন উৎসর্গ করে সারা জগতবাসীকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে, কারবালার প্রান্তরে ঈয়াযীদ সহ তার বিশাল বাহিনীর কেউই মুসলমান ছিল না ।

ইমাম হোসাইন (আ:) শাহাদাতের পূর্বে শেষবারের মতো ইয়াজিদ সৈন্যদের যে ভাষণটি দিয়েছিলেন তা শুধু ইয়াজিদ সৈন্যদের জন্যই নয় বরং কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মুসলমানদের জন্য একটি শিক্ষা হয়ে রইল। সত্যিই সেদিন ইয়াজিদের পক্ষে একজন মুসলমানও ছিল না, ছিল সবই মুনাফেক।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ