বরকতময় নাম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
মুসলিম উম্মার নবজাতক শিশুর নামের প্রথমে মুহাম্মাদ নাম রাখার রহস্য ও গুরুত্ব।
বর্তমান এই ফ্যাতনার যুগে শত শত ফ্যাতনার মোধ্যে নতুন এক ফ্যাতনার উদয় গুটিয়েছ -কিছু দিন আগে- Musafir Babu নামের ফেইসবুক আইডি থেকে একটা পোস্ট দেখে আমি হতভাগ হয়ে গিয়েছি। তার পোস্ট কিছু অংশ -
মুসলমান পুরুষের নামের আগে মুহাম্মাদ এবং মেয়েদের নামের আগে মুসাম্মাৎ লেখা বা বলার নিয়ম নবী করীম (ছাঃ), ছাহাবা ও তাবেঈনের যুগে ছিল না। এমনকি আরব দেশগুলোতে এখনও নেই। এই নিয়মটি ভারত উপমহাদেশেই বেশী প্রচলিত।। নাউজুবিল্লাহ।
বাতিল ফিরকার এই কথাগুলো ডাহামিথ্যে।
প্রমান দেখুনঃ
সাহাবী --মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রাঃ
মাযাহাব --ইমাম আহমদ বিন মুহাম্মাদ বিন হাম্বল আবু আবদুল্লাহ আল-শাইবানী।
হাদিসের ইমাম বুখারীর নাম --মুহাম্মদ বিন ইসমাইল বিন ইবরাহীম বিন মুগীরাহ বিন বারদিযবাহ।
এ-থেকেই প্রমান হয় মুহাম্মদ নাম রাখা প্রচলন ভারতীয় নয়। ইহা সাহাবিদের সময় থেকেই চালু হয়েছে।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের নাম 'মুহাম্মদ'। কেবল ইসলাম ধর্মের অনুসারীই নয়; অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের কাছেও তিনি সমানভাবে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব।
সেই মহাপুরুষের নাম পৃথিবীর অনাদি অনন্তকাল ধরে উজ্জীবিত থাকবে, সেটাই বাস্তব সত্য। '
রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি তার গর্ভবতী স্ত্রীর গর্ভের সন্তানের নাম 'মুহাম্মদ' রাখার সিদ্ধান্ত নেবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে পুত্র সন্তান দান করবেন। আর যে ঘরে 'মুহাম্মদ' নামের কোনো ব্যক্তি থাকবে, আল্লাহ তায়ালা সব সময় সে ঘরে বরকত অব্যাহত রাখবেন। (ফাজায়েলুত্তাসমিয়া বি-আহমদ ওয়া মুহাম্মদ)
রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের নাম 'মুহাম্মদ' রেখে তাকে গালি দিও না। (হাকেম, হা. ৭৭৯৫)
অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, প্রত্যেক জান্নাতীকে তার নামেই ডাকা হবে।
তবে হজরত আদম (আ.)-কে আবু মুহাম্মদ বলে ডাকা হবে। (সিফাতুল জান্নাহ, আবু নুআঈম)
হজরত ইবনে ওয়াহাব বলেন, আমি নিজের সাতটি সন্তানের নাম গর্ভাবস্থায়ই মুহাম্মদ রাখার নিয়ত করেছি, এর বরকতে সব সন্তানই ছেলে হয়েছে। (কাশফুল গুম্মাহ ১/২৮৩)
ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, যে ঘরেই মুহাম্মদ নামের কোনো ব্যক্তি থাকবে তাতে বরকত ছড়াতে থাকবে। (ফয়জুল ক্বদীর-৫/৪৫৩)
হজরত আবদুর রহমান ইবনে আবী লায়লা (রহ.) বর্ণনা করেন, আমিরুল মু'মিনীন হজরত উমর (রা.) আবু আবদুল হামীদের দিকে তাকালেন, যার নাম মুহাম্মদ ছিল। এমতাবস্থায় অন্য এক ব্যক্তি মুহাম্মদকে গালাগাল করছিল। তখন আমিরুল মুমিনীন বললেন, হে ইবনে যায়েদ, এদিকে আসো! এবং বললেন, আমি দেখছি যে, তোমার নাম মুহাম্মদ হওয়ায় আমাদের সরদার হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেওয়া হচ্ছে। আল্লাহ তায়ালার কসম! যতদিন আমি জীবিত আছি, আজ থেকে যেন তোমাকে আর মুহাম্মদ নামে না ডাকা হয়। অতঃপর তার নাম আব্দুর রহমান রাখলেন। এরপর তালহার সন্তানদের ডেকে পাঠালেন, তাদের সংখ্যা তখন সাতজন ছিল। যাদের বড়জনের নাম মুহাম্মদ ছিল- এ উদ্দেশ্যে যে তারা যেন তাদের মুহাম্মদ নাম পরিবর্তন করে নেয়। মুহাম্মদ ইবনে তালহা তখন বললেন, আল্লাহর শপথ! আপনি এ কী করছেন? স্বয়ং নবী করিম (সা.) আমার নাম মুহাম্মদ রেখেছেন। এতে হজরত উমর (রা.) বললেন, যখন রাসুল (সা.) নিজেই এ নাম রেখেছেন, তাহলে তো আমার কোনো পথ নেই। (মুসনাদে আহমাদ ৪/২১৬)
‘মুহাম্মদ’ শব্দের বায়োডাটাঃ
‘মুহাম্মদ’ শব্দের মুল ধাতু হচ্ছে- ‘হা’ ‘মিম’ ‘দাল’ তথা ‘হামদুন’। যার অর্থ প্রশংসা, স্তুতি, সুুনাম, কৃতজ্ঞতা, প্রতিদান ইত্যাদি। আর মুহাম্মদ শব্দের অর্থ হলো- অতীব প্রশংসিত। হাকিমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খাঁন নঈমী (রহ.) ‘তফসিরে নঈমী’তে এভাবেই অর্থ করেছেন- চারিদিকে, সর্বদা, সকল ভাষায়, সকল যুগে প্রশংসিত। মোদ্দাকথা এটাই যে, হুজুর পুরনুর ( ﷺ) যেমনি ভাবে সকল নবীদের সরদার, তেমনি ভাবে তাঁর নুরানী নাম মোবারকও সকল নামের ঊর্ধ্বে, তথা নামের সরদার। কবির মনের মাধুরিতে অতি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে-
‘‘নুহ ও খলিল ও ঈসা ও মুসা, ছবকা হে আঁকা নামে মুহাম্মদ
দৌলত জু চাহো দোনো জাঁহা কি, করলো ওয়াজীফা নামে মুহাম্মদ
পায়ে মুরাদে দোনো জাঁহা মে, জিসনে পুকারা নামে মুহাম্মদ’’। (কারবালায়ে বখশিশ, পৃষ্ঠা- ৭০)
‘মুহাম্মদ’ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নামের অন্তরালে অজানা ইতিহাসঃ
বিভিন্ন রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে মানব সমাজে এ কথা প্রসিদ্ধ যে, নবীজির নাম মোবারক ‘মুহাম্মদ’, তাঁর সম্মানিত দাদাজান আবদুল মোত্তালিব রেখেছিলেন। কথা সত্য এবং বিশুদ্ধ (সীরাতে হালভীয়া, প্রথম খন্ড)। এ প্রসঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম ‘মরুভাস্করে’ এভাবেই লিখেছেন,
“কহিল মুত্তালিব বুকে চাপি’ নিখিলের সম্পদ-
‘নয়নাভিরাম! এ শিশুর নাম রাখিনু ‘মোহাম্মদ’।”
তবে এ মহান নাম মুবারক যে সর্বপ্রথম স্বয়ং রাব্বুল আলামিনই রেখেছেন, এ ইতিহাস ক’জনেই বা জানে? যাবতীয় ক্ষমতার একচ্ছত্র মালিক, ‘কুন’ শব্দের কারিশমাতে যিনি সমগ্র কায়েনাত সৃষ্টি করেছেন, সেই মহান সত্ত্বা যখন আপন প্রভূত্ব প্রকাশ করবার ইচ্ছা করলেন, তখনই নিজের কুদরতি নুর মোবারক থেকে নুর নিয়ে আদেশ করলেন- ‘কু-নী হাবিবী মুহাম্মাদান’! খোদার খোদায়ী খেল্ বুঝা মুশকিল! ‘অতি প্রশংসিত’ সম্বোধন করে যাঁকে সৃষ্টি করলেন, তিনি আপন সত্ত্বাকে আপন রূপে প্রকাশ পাওয়া মাত্রই সিজদায় পড়ে যা উচ্চারণ করেছিলেন, তা- ‘আলহামদুলিল্লাহ্’-‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য’! আশেক-মাশোকের ব্যাপারটা ঠিক এমনই- প্রথম জন দু’লাইন প্রশংসা করলে, পরের জন খুব করে চায় যে, সে অন্তত চার লাইন করবে। তাইতো আল্লাহ তায়ালার ‘মুহাম্মদ’ সম্বোধনের পরিবর্তে নবীজি খোদার প্রশংসায় বেছে নিলেন ‘মুহাম্মদ’ শব্দের ‘মাদ্দাহ’কেই। কেননা ব্যাকরণের দৃষ্টিতে মুল ধাতুর ব্যাপকতার চেয়ে অধিক বিশ্লেষণ যোগ্য আর কিছুই নেই। তাই নবীজি খোদার প্রশংসায় খোদার দেয়া আপন নামের ধাতুকেই নির্বাচিত করলেন, যাতে করে ‘প্রশংসা’রও যিনি স্রষ্টা, তাঁর প্রশংসার যাতে কোন কমতি না হয়। সুবহানাল্লাহ্! (বাহারে শরীয়ত, অধ্যায়-১৬, ৩য় খন্ড, পৃষ্টা- ৬০১)
স্রষ্টার সবচে প্রিয়, সৃষ্টিতে রহস্যময় নাম, নামে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামঃ
মুসলমান হওয়ার প্রথম ছবক- ‘‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’’ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। তিঁনি তো আল্লাহ্! সকল ক্ষমতার উৎস, বে’মেছাল, বে’শরীক, যাবতীয় গুণের উর্ধ্বে, মর্যাদায় যাঁর উঁচু-নিচু নাই। সর্বত্র মহা প্ররাক্রমশালী, মহা মর্যাদাময়। চায়লে একটি অক্ষর নিজের শানে বেশি রাখতেই পারতেন। কিন্তু না, বর্ণ সংখ্যা সমানে সমান। যদ্দুর নিজের শান, তদ্দুর হাবীবের জন্যেও বরাদ্দ দিলেন। বারো-এগারো কিংবা তেরো-বারো নয়, একেবারে কাঁটায় কাঁটায়, ঠিক বারো’টি করে। ও হ্যাঁ, উপরে-নীচে নয়, পাশাপাশি ছিলো, ওই আরশে মোয়াল্লাতেও। গায়েবের মালিক খোদা তায়ালা জানতেন যে শেষ জামানায় কিছু ‘জানোয়ার’ নামের কাঠমোল্লারা নবীকে নিয়ে টানা-হেঁছড়া করবে, উপর থেকে নিচে নিতে চাইবে, সর্বোপরি মুছে ফেলতে চাইবে। তাই একেবারে ‘লাইফ গ্যারান্টি’ সহকারে আরশের পায়ায়, জান্নাতের গাছে গাছে, পাতায় পাতায় লিখে দিয়েছেন একই লাইনে-
’’لا اله الا الله محمد رسول الله‘‘
যাঁর বর্ণনা বিস্তারিত নিচে আলোচনা করেছি। আহা! এ কেমন নাম, যাঁ স্বয়ং খোদার নামের পাশে! এ কেমন নাম, যাঁ স্বয়ং স্রষ্টাও তাঁর নুরানী নাম মোবারকের সাথে মিলিয়ে ‘চার অক্ষর’ বিশিষ্ট করে রাখলেন! এ ‘চার’ এর ভেতর আবার আজব খেলা, যা মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী (রহ.) এভাবেই বর্ণনা করেছেন-
‘‘চার রাসূল, ফেরেস্তে চার, চার কুতুব হ্যায়, দ্বীন চার
সিলসিলে দ্বীনো চার চার, লুৎফ আজিব হ্যায় চার মে।
আ’তিস ওয়া আ’ব ওয়া হা’ক ওয়া বা’দ, সবকা উনহী-ছে হ্যায় সাবাত
চারকা ছা-রা মা-জেরা খতম হ্যায় চার বার মে।’’
(শানে হাবিবুর রহমান, ২১২ পৃষ্ঠা)
আহা! এ কেমন প্রেমের নমুনা! নিজের নামের সাথে মিলিয়ে বন্ধুর নাম রাখলেন চার অক্ষরের। আর সে চার এর প্রেমে পড়ে সৃষ্টি করলেন শ্রেষ্ঠ জিনিষ গুলোর অধিকাংশই চারটি করে।
আরো বিশ্লেষণ করা যাক- ‘محمد-الله’ দেখুন তো খেয়াল করে- ‘الله’ শব্দে ‘الف’ ওবং ‘ه’ একবার করে, কিন্তু ‘ل’ বর্ণটি দু’বার। একই ভাবে ‘محمد’ শব্দে ‘ح’ ও ‘د’ এক বার করে, কিন্তু ‘م’ বর্ণটি দু’বার! আরো লক্ষ্য করুন- ‘আল্লাহ’ শব্দের তৃতীয় অক্ষর ‘মুশাদ্দিদ’ তথা তাশদিদ যুক্ত, একই ভাবে ‘মুহাম্মদ’ শব্দেরও তৃতীয় বর্ণে ‘মুশাদ্দিদ’! এ কি প্রেম! এ কি রহস্য! বাস্তবিক পক্ষে কোনদিনই কী এঁর গুঢ়রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব?
হাকিমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খাঁন নঈমী (রহ.), ‘শানে হাবিবুর রহমান’ এর ২১৩ পৃষ্টায় আরো লিখেছেন যে, ‘মুহাম্মদ শব্দের দুই ‘মীম’ দ্বারা দুই জগৎ দুনিয়া ও আখিরাতে ‘মালিক’ বুঝানো হয়েছে। ‘হ্বা’ দ্বারা সৃষ্টি জগতের রহমত, আর ‘দ্বাল’ দ্বারা ‘দায়েমী’ তথা স্থায়ী বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ পুরো মুহাম্মদ শব্দের রহস্যময় অর্থ হলো- ‘দুনিয়া-আখিরাতের স্থায়ী রহমত’ তথা ‘ওয়া মা আরসালনা-কা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আলামিন’, সুবহানাল্লাহ্!
এবার একটু উচ্চারণের দিকে যাওয়া যাক। প্রথমে ‘আল্লাহ’ শব্দের উচ্চারণ করে দেখি। ঠোঁট দু’খানা বিসৃত হয়ে যাচ্ছে কী? এবার একটু ‘মুহাম্মদ’ শব্দের উচ্চারণ করা হোক। ওষ্ঠাধর পরস্পর পরস্পরের সাথে মিলিত হয়ে ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিয়েছে নিশ্চয়? কেন? কারন আল্লাহর শান অনন্ত-অসীম-বিসৃত, যেখানে আমাদের পৌঁছা অসম্ভব। এ জন্য ‘আল্লাহ’ উচ্চারণে ঠোঁট বিসৃত হয়ে যায়। প্রক্ষান্তরে ‘মুহাম্মদ’ উচ্চারণের সময় ঠোঁট লেগে যায়, কেননা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার একমাত্র বাহন হলো ঐ মুহাম্মদ’ই, যাঁর সাথে লেগে থাকলে খোদ খোদা পর্যন্ত পৌঁছা যায়, সুবহানাল্লাহ্! (শানে হাবীবুর রহমান-২১৩)
সৃষ্টি জগতের সর্বত্র ‘মুহাম্মদের’ নামঃ
‘তাওহীদেরই মুর্শিদ আমার মুহাম্মদের নাম মুর্শিদ মুহাম্মদের নাম ঐ নাম জপলে বুঝতে পারি খোদায়ী কালাম মুর্শিদ মুহাম্মদের নাম।’
(কাজী নজরুল ইসলাম)
প্রথমেই সেই খোদায়ী কালাম কুরআনের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধন করা যাক। প্রবিত্র কুরআনে কারিমে আল্লাহ পাক নবীজির নাম ‘মুহাম্মদ’কে সরাসরি মোট চার জায়গায় এনেছেন। চারের মাঝে যে আজব খেল, তা ইতোপূর্বে আলোকপাত হয়েছে। এখন শুধু আঙুল দিয়ে এটা দেখিয়ে দেয়া বাকি যে, কোরআনের কোন সে বিশেষ চারটি স্থান, যেখানে আল্লাহ তায়ালা ‘মুহাম্মদ’ নামকে সরাসরি উল্লেখ করেছেন। চলুন তবে দেখে আসি-
(১) ﻭَﻣَﺎ ’’ﻣُﺤَﻤَّﺪ‘‘ٌ ﺇِﻟَّﺎ ﺭَﺳُﻮﻝٌ ﻗَﺪْ ﺧَﻠَﺖْ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻠِﻪِ ﺍﻟﺮُّﺳُﻞُ ﺃَﻓَﺈِن ﻣَﺎﺕَ ﺃَﻭْ ﻗُﺘِﻞَ ﺍﻧْﻘَﻠَﺒْﺘُﻢْ ﻋَﻠَﻰ ﺃَﻋْﻘَﺎﺑِﻜُﻢْ ﻭَﻣَﻦْ ﻳَﻨْﻘَﻠِﺐْ ﻋَﻠَﻰ ﻋَﻘِﺒَﻴْﻪِ ﻓَﻠَﻦْ ﻳَﻀُﺮَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﺷَﻴْﺌًﺎ ﻭَﺳَﻴَﺠْﺰِﻱ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺍﻟﺸَّﺎﻛِﺮِﻳﻦَ
অর্থাৎ- “মুহাম্মাদ ( ﷺ ) অবশ্যই আল্লাহর রাসূল। তাঁর আগেও অনেক রাসূল পর্দা করেছেন। অতপর তিনি যদি পর্দা করেন, তবে কী তোমরা পেছনে ফিরে যাবে? যারা পেছনে ফিরে যায় তারা আল্লাহর কোন ক্ষতিই করতে সক্ষম নয়। শীঘ্রই আল্লাহ কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত নং- ১৪৪,)
(২) ﻣَّﺎ ﻛَﺎﻥَ ’’ﻣُﺤَﻤَّﺪ‘‘ٌ ﺃَﺑَﺎ ﺃَﺣَﺪٍ ﻣِّﻦ ﺭِّﺟَﺎﻟِﻜُﻢْ ﻭَﻟَﻜِﻦ ﺭَّﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺧَﺎﺗَﻢَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻴِّﻴﻦَ ﻭَﻛَﺎﻥَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺑِﻜُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻋَﻠِﻴﻤًﺎ
অর্থাৎ- ‘‘মুহাম্মদ ( ﷺ ) তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত।’’ (সুরা আহযাব, আয়াত নং ৪০)
(৩) ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﻭَﻋَﻤِﻠُﻮﺍ ﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤَﺎﺕِ ﻭَﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﺑِﻤَﺎ ﻧُﺰِّﻝَ ﻋَﻠَﻰ ’’ﻣُﺤَﻤَّﺪٍ‘‘ ﻭَﻫُﻮَ ﺍﻟْﺤَﻖُّ ﻣِﻦ ﺭَّﺑِّﻬِﻢْ ﻛَﻔَّﺮَ ﻋَﻨْﻬُﻢْ ﺳَﻴِّﺌَﺎﺗِﻬِﻢْ ﻭَﺃَﺻْﻠَﺢَ ﺑَﺎﻟَﻬُﻢْ অর্থাৎ- ‘‘যাঁরা বিশ্বাস স্থাপন করে, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে মুহাম্মদ (ﷺ) এঁর প্রতি অবতীর্ণ সত্যে বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাদের মন্দ কর্মসমূহ মার্জনা করেন এবং তাদের অবস্থা ভাল করে দেন।’’ (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত নং- ২)
(৪) ﻣُّﺤَﻤَّﺪٌ ﺭَّﺳُﻮﻝُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻣَﻌَﻪُ ﺃَﺷِﺪَّﺍﺀ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻜُﻔَّﺎﺭِ ﺭُﺣَﻤَﺎﺀ ﺑَﻴْﻨَﻬُﻢْ ﺗَﺮَﺍﻫُﻢْ ﺭُﻛَّﻌًﺎ ﺳُﺠَّﺪًﺍ ﻳَﺒْﺘَﻐُﻮﻥَ ﻓَﻀْﻠًﺎ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺭِﺿْﻮَﺍﻧًﺎ ﺳِﻴﻤَﺎﻫُﻢْ ﻓِﻲ ﻭُﺟُﻮﻫِﻬِﻢ ﻣِّﻦْ ﺃَﺛَﺮِ ﺍﻟﺴُّﺠُﻮﺩِ
অর্থাৎ- ‘‘আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (ﷺ ) এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাঁদেরকে রুকু ও সেজদারত দেখবেন। তাঁদের মুখমন্ডলে রয়েছে সেজদার চিহ্ন।’’ ( সুরা আল ফাতাহ্, আয়াত নং- ২৯)
এবার নবীজির হাদীস মোবারকের ভাষ্যে নবীজির নাম মোবারকের সত্যতা সম্পর্কে জানা যাক। হযরত জুবাইর ইবনে মুতয়িম (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহ) হতে বর্ণিত,
ﺇﻥَّ ﻟﻲ ﺃﺳﻤﺎﺀً : ﺃﻧﺎ ﻣﺤﻤَّﺪٌ ﻭﺃﻧﺎ ﺃﺣﻤﺪُ ﻭﺃﻧﺎ ﺍﻟﻤﺎﺣﻲ ﺍﻟَّﺬﻱ ﻳﻤﺤﻮ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑﻲ ﺍﻟﻜﻔﺮَ ﻭﺃﻧﺎ ﺍﻟﺤﺎﺷﺮُ ﺍﻟَّﺬﻱ ﻳُﺤﺸَﺮُ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﻋﻠﻰ ﻗﺪَﻣِﻪ ﻭﺃﻧﺎ ﺍﻟﻌﺎﻗﺐُ ﺍﻟَّﺬﻱ ﻟﻴﺲ ﺑﻌﺪَﻩ ﻧَﺒﻲٌّ ) ﻭﻗﺪ ﺳﻤَّﺎﻩ ﺍﻟﻠﻪُ ﺭﺅﻭﻓًﺎ ﺭﺣﻴﻤًﺎ.
(ﺍﻟﻤﺼﺪﺭ : ﺻﺤﻴﺢ ﺍﺑﻦ ﺣﺒﺎﻥ)
অর্থাৎ- নবীজি নুরানী জবানে ইরশাদ করেছেন, আমার বহু নাম রয়েছে। যেমন আমি ‘মুহাম্মদ’ ও ‘আহমদ’। এবং আমি ‘মাহি’, কেননা আমার দ্বারা’ই আল্লাহ তায়ালা কুফরকে দাফন করবেন। আর আমি ‘হাশির’, কেননা সমগ্র মানবজাতির হাশর আমার পদতলেই কায়েম হবে। এবং আমি ‘আকিব’, যেহেতু আমার পরে আর কেউ (নবী-রাসূল) আসবেন না। এবং নবীজির নাম আল্লাহ পাক ‘রাউফ’ এবং ‘রাহিম’ রেখেছেন। ( ইবনে হিব্বান শরীফ, হাদীস নং-৬৩১৩)
একটু গভীর ভাবে লক্ষ্য করুন, উল্লেখিত হাদীস শরীফে নবীজি তাঁর বিভিন্ন নামের উল্লেখপূর্বক সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। কিন্তু ‘মুহাম্মদ’ এবং ‘আহমদ’ নামের কোন ব্যাখ্যা করেন নি। এ থেকে প্রথমত বুঝা যায় যে, এগুলো এমন নাম, যাঁ ব্যাখ্যাতীত, অবর্ণনীয়, অতুলনীয়। দ্বিতীয়ত এ নামের ডঙ্কা মুলত প্রকাশিত হবে ময়দানে মাহাশরে নবীজিকে দোলহা সাজিয়ে ‘মকামে মাহমুদে’ অধিষ্ঠিত করার মাধ্যমে, যা পরবর্তি ‘হাশির’ নামের মাধ্যমে খানিকটা ইঙ্গিত দিয়েছেন। আরেকটি বিষয় লক্ষনীয় যে, বর্ণনার ক্ষেত্রে নবীজি ‘মুহাম্মদ’ নামটিকেই প্রথম স্থান দান করার জন্য মনোনীত করেছেন। এ থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, ‘মুহাম্মদ’ নামের তাৎপর্য কত অসীম, অনন্ত, অতুলনীয়।
চলুন একটু আরশ-কুরসী-লৌহ-কলমের দিকে ভ্রমন করে আসি-
(১)ঈমাম আবু নাঈম (রহ.) তাঁর স্বীয় গ্রন্থ ‘আল হিলইয়া’য় হযরতে আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবীজ্বি ইরশাদ করেছেন, ‘‘জান্নাতে এমন কোন গাছের পাতা নাই, যাতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ অঙ্কিত নেই।
(২)ঈমাম হাকেম (রা.) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ পাক ঈসা (আলাইহিস সালাম) এঁর প্রতি এই প্রত্যাদেশ পাঠালেন যে, হে ঈসা! আপনি মুহাম্মদ (দ.) এর প্রতি ঈমান আনয়ন করুন এবং আপনার কওমদের বলে দেন যে, তাঁরা যদি মুহাম্মদ ﷺ কে পেয়ে যায়, তবে যেন তাঁর প্রতি ঈমান আনে। কেননা আমি যদি তাঁকে সৃষ্টি না করতাম তবে আদম (আ.), বেহেস্ত-দোযখ কিছুই সৃষ্টি করতাম না। আল্লাহ পাক আরো ইরশাদ করেছেন যে, আমি পানির পৃষ্ঠে ‘আরশ’ সৃষ্টি করলাম, অতঃপর তা দোলতে থাকলো। যখনই আমি তার পায়া’য় ‘মুহাম্মদ’ নাম লিখে দিলাম, তখন তা স্থির হয়ে গেলো। সুবহানাল্লাহ্! (খাছায়েছে কুবরা, মাদারেযুন্নবুওয়াত)
আদম (আ.)। ওনার নাম শুনেছেন তো? জ্বি, আমাদের আদি পিতা সায়্যিদিনা আদম (আ.) এঁর কথায় বলছি। চলুন তাহলে, ওনার সঙ্গে সংঘটিত কিছু ঘটনার বিবরণ দেয়া যাক-
হযরত সায়্যিদিনা ওমর ইবনে খাত্তাব (রাদ্বিআল্লাহু তায়ালা আনহ্) থেকে রেওয়ায়েত, নবীয়ে দো’জাঁহা ইরশাদ করেছেন, আদম (আ.) কে বেহেস্ত থেকে জমিনে প্রেরণ করার প্রায় সাড়ে তিন’শ বছর পর হঠাৎ একদিন আপন মালিকের দরবারে এই বলে ফরিয়াদ করেন যে, ‘‘ইয়া আল্লাহ্! আপনি হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর উচিলায় আমার ত্রুটি ক্ষমা করুন। বিশ্ব জগতের ত্রাতার প্রশ্ন- ‘আপনি হযরত মুহাম্মদ ﷺ কে কিভাবে চিনলেন?’ প্রথম মানবের ঝটপট উত্তর- ‘আপনি যখন আমাকে আপনার কুদরতি হাতে সৃষ্টি করে রূহ সঞ্চার করলেন, ঠিক তখনই আমি মাথা তুলে উপরের আরশের গা’য়ে যা দেখেছিলাম, তা ছিল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ’! আর সেদিনই আমি বুঝে নিয়েছিলাম, এই নামের সত্ত্বাকেই আপনি সবচে বেশি পছন্দ করেন, ভালোবাসেন। রাব্বুল আলামিন তার সৃষ্ট দুনিয়াতে প্রেরিত প্রথম নবীর বক্তব্যকে সত্য হিসেবে আখ্যায়িত করে ঘোষণা দিলেন, হে আদম! মুহাম্মদ ﷺ না হলে তুমিও হতে না। সুবহানাল্লাহ্! (বায়হাকি, তাবরানি, আবি নাঈম ইত্যাদি)
মুহাম্মদ নামের উপর ক্রাস খেয়ে পিতাজ্বি আদম (আ.) এতটুকুতেই ক্ষান্ত হননি, বরং আপন পুত্র শীছ (আ.) কে উপদেশ বাণী শুনালেন যে, ‘‘ওহে আদরের প্রিয় বৎস! তুমি তো আমার অন্তে আমারই খলিফা। অতঃএব শোন! তুমি অবশ্যই খোদাভীতি অবলম্বন করবে, আর যখনই আল্লাহর স্মরণ করবে তখন যেন মুহাম্মদﷺ এর স্মরণে বিচ্যুত না হও! কেননা তোমার পিতা যখন রূহ এবং মৃত্তিকার মধ্যবর্তি অবস্থায় ছিলো, তখনই আমি তাঁর(মুহাম্মদ) নাম আরশের গায়ে লিখা দেখেছিলাম। অতঃপর আমি সমগ্র আকাশে ভ্রমন করেছি, সেখানে এমন কোন মকাম দেখিনি, যেখানে ‘মুহাম্মদ’ নামের সীল ছিলো না। আমার প্রভু যখন আমাকে জান্নাতে বসবাসের সুযোগ দিয়েছিলেন, তখন আমি এমন কোন প্রাসাদ কিংবা কক্ষ দেখিনাই, যেখানে ‘মুহাম্মদ’ নাম অঙ্কিত ছিলো না। ওই নাম মোবারক আমি আরো অবলোকন করেছি- হুরদের কন্ঠনালীতে, বেহেস্তি বৃক্ষদের ঢালে ঢালে, পাতায় পাতায়, সিদরাতুল মুনতাহায়, ফেরেস্তাদের ভ্রুকুটির মধ্যখানে। অতএব, ওগো আমার প্রাণাধিক শীছ! তুমি অধিক হারে ‘মুহাম্মদ’ নামের যিকির করো, কেননা ফেরেস্তারা প্রতিটি মুহুর্তে ঐ নামের যিকির করে। শায়ের সেলিম রিয়াদ অত্যন্ত চমৎকারই লিখেছেন,
‘‘বেহেস্তের পাতায় পাতায় লতায় লতায় নবীর নাম
আরশে আল্লাহর নামের সাথে নবীর নামের মনোগ্রাম।
আল্লাহ বেহেস্ত বানালেন নবীর প্রেমেতে
আল্লাহ হাসর করিবেন নবীর শান দেখাতে।’’
(খাছায়েছে কুবরা, ঈমাম আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ুতি রহ.)
পৃথিবীময় নামে মুহাম্মদঃ
এ তো গেলো উর্ধ্বজগতের বর্ণনা। ইহজগতে ঐ নামের স্তুতি-জয়গান কিরূপ, তা না লিখলে হয় কী? রাব্বুল আলামিন তাঁর আপন মাহবুবের নুরানী নাম মোবারকের ‘সীল মোহর’ যে সর্বত্র লাগিয়ে দিয়েছেন, তা ‘হেরেম-নববী’ পেরিয়ে পৃথিবীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মসজিদ গুলোর কপালের মুকুট রূপে শোভা বর্ধন করেই যাচ্ছে। অতঃপর কোন ‘জানোয়ার’ এর হীন সড়যন্ত্রে তা কীরূপে উচ্ছেদ হওয়া সম্ভব? যেখানে রাব্বুল ইজ্জত নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ورفعنا لك ذكرك’ অর্থাৎ- ‘আমি নিজেই আপনার স্মরণকে সমুজ্জ্বল করেছি।’ (সুরা আলাম নাশরাহ্, আয়াত-৪) পৃথিবীর আদি-অন্তে দ্বিতীয় এমন কোন নাম শত পাওয়ারের লাইট দিয়েও খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়, যে নামটির চর্চা ‘মুহাম্মদ’ এর চেয়ে অধিক। আরব বিশ্বে সর্বাধিক যে নামের শিশু জন্ম নেয়, তা ‘মুহাম্মদ!’ আরব বিশ্বে এটি মুল নাম হিসেবেই প্রচলিত। শুধু আরব নয় বহির্বিশ্বেও ‘মুহাম্মদ’ নামের জনপ্রিয়তাই সবচে বেশি। যা নিম্নোক্ত তথ্যই প্রমাণ করে-
(১) ইউরোপের সবচে জনপ্রিয় নাম ‘মুহাম্মদ’। ২০১৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ইউরোপে সর্বাধিক জন্মগ্রহণকারি শিশুর নাম ‘মুহাম্মদ’! (দৈনিক সংগ্রাম, ৫ সেপ্টেম্বর-১৬, সোমবার, আন্তর্জাতিক কলাম)
(২) মুসলমানদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর নামটি অনেক মুসলমান নিজের সন্তানের নাম হিসেবে রাখেন। এ নামটি যুক্তরাজ্যে শীর্ষস্থান দখল করেছে। (দৈনিক প্রথম আলো, ২ ডিসেম্বর-১৪)
নামে মুহাম্মদ নিয়ে শুধু যে চাঁদ-সেতারা দোল খায়; তা কিন্তু নয়, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী, গাছ-গাছালি, পাখ-পাখালি, সর্বোপরি প্রতিটি সৃষ্টি ঐ নামের স্মরণেই মত্ত, যে অপ্রকাশিত ঘটনা গুলো আমরা মাঝে মধ্যে প্রকাশিত রূপে মাছের গায়ে, গোসতের টুকরায়, মেঘের অদ্ভূত অবয়ব গঠনে, গাছেদের শাখা-প্রশাখায় দেখতে পাই। সেরূপ দু’একটি ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে বর্ণনার প্রয়াস পাচ্ছি।
(১) আল্লামা ইউসুফ ইবনে নিবহানি (রা.) বলেন, একদা একটা দ্বীপের মধ্যে এমন এক অদ্ভূত গাছ পেলাম, যে গাছের পাতা গুলোতে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ লিখা ছিলো, সুবহানাল্লাহ্! (হুজ্জাতিল্লাহি আলাল আ’লামিন)
(২) আল্লামা ইয়াফেয়ী (রা.), আবু ইয়াকুব সাইয়েদ হতে বর্ণনা করেছেন যে, একদা আমি ‘উবলা’ নামক নদীতে মাছ ধরছিলাম। হঠাৎ এমন এক মাছ পেয়ে গেলাম, যেটার গায়ে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ অঙ্কিত ছিলো। (রাউযাতুর রায়াহীন)
এভাবে আরো বহু ঘটনা ‘হায়াতে হায়ওয়ান’ নামক গ্রন্থে বর্ণিত রয়েছে। সুতরাং উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, খোদার খোদায়ী যতদূর বিস্তৃত, ঠিক ততটুকু জায়গা জুড়ে ‘মুহাম্মদ’ নামের যিকির সর্বদা আবহমান।
ফাযায়েলে ইসমে মুহাম্মদ ﷺ:
সূর্যকে পরিচয় করিয়ে দেবার দরকার হয় কী? যখন সূর্য উদিত হয়, তখন তাঁর মহিমা দেখে কেউ তাকে চিনে নিতে ভুল করে না। খুশবো শুঁকে অন্ধও বলে দিতে পারবে কোনটি গোলাপ আর কোনটি গাদা কিংবা চামেলী। অন্ধকার রাতে যখন দুনিয়াজুড়ে জোছনা ছড়াতে থাকে, তখন চাঁদের গুরুত্ব, ফযিলত, গুণাগুন কোনটির বর্ণনা প্রয়োজন পড়ে না। তবু মানুষ হেতু চায়। কোন কারণে কী হয়, জানতে চায়। যে কিনা দেখে দেখে ঠিকটাক পড়তে শেখে নি, সেও দলিল চায়। আর একটা সহজ বিষয় আছে- সুনির্দিষ্ট বিষয়ের সাথে কোন কোন ফযিলত বিদ্যমান, তা জানা থাকলে নির্দিষ্ট পন্থায় আগানো যায়। এরূপ একটা প্রবাদও আছে যে, ‘বলের চেয়ে কল ব্যবহার করলে গাধা খাটুনি খাটতে হয় না’। তাই যদিওবা উপরের আলোচনা থেকে ‘মুহাম্মদ’ নামের ফযিলত সম্পর্কে যে কেউ অনুমান করতে পারবে, তবুও সংক্ষিপ্ত পরিসরে এ ব্যপারে আলোচনার প্রয়াস পাচ্ছি।
(১) হাকিমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খাঁন নঈমী (রহ.), ’শানে হাবিবুর রহমান’ এ উল্লেখ করেছেন যে, যদি কোন মহিলার শুধু কন্যা সন্তান জন্ম লাভ করার ফলে এমন হয় যে, সে একটি পুত্র সন্তানের প্রত্যাশা করে। অতঃপর তার স্বামী যদি ঐ স্ত্রীলোকের গর্ভধারন থেকে শুরু করে তার পেটের উপর আঙ্গুল দ্বারা একাধারে চল্লিশ দিন যাবত ‘من كان فى هذه البطن فا اسمه محمد’ এ তাসবিহ্ লিখে দেন, তবে তার স্ত্রীর পেটের সন্তান আল্লাহর রহমতে পুত্রসন্তান হিসেবে জন্ম লাভ করবে, সুবহানাল্লাহ! (শানে হাবিবুর রহমান)
(২) হাদীসে পাকে ইরশাদ হয়েছে, যদি কারো ঘরে ছেলেসন্তান জন্ম নেবার পর আমার মোহাব্বতে এবং আমার নামের বরকত অর্জনের জন্য তার নাম ‘মুহাম্মদ’ রাখা হয়, তবে সেঁ এবং তাঁর সন্তান উভয়েই জান্নাতে প্রবেশ করবে। (কানযুল উম্মাল, কিতাবুন নিকাহ, কানযুল আকওয়াল, ৮ম অধ্যায়, হাদীস নং-৪৫২১৫)
(৩) নবীজি আরো ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন দু’জন ব্যক্তিকে দাঁড় করানো হবে। আদেশ হবে- এঁদের জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হোক। তাঁরা জানতে চাইবে, ‘ইয়া মাওলা! জান্নাতে যাবার মত তেমন আমল তো আমরা করি নি, তাহলে আমাদের জান্নাতে দেবার কারণ কী?’ অনন্ত-অসীম দয়ালু আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করবেন- ‘জান্নাতে প্রবেশ করো, কেননা আমি শপথ করেছি যে, যাঁর নাম ‘আহমদ’ কিংবা ‘মুহাম্মদ’ হবে, সেঁ জাহান্নামে যাবে না’ সুবহানাল্লাহ্! (ফিরদাউসুল আখবার, হাদীস নং-৮৫১৫)
(৪) অনুরূপভাবে কানযুল উম্মালের ‘৪৫২১৩’ নং হাদীস শরীফে এসেছে- ‘যে ব্যক্তি বরকত লাভের আশায় আমার নামে নাম রাখবে, কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর উপর রহমত বর্ষিত হবে।
(৫) হাদীস রাসূলের মধ্যে আরো ইরশাদ হয়েছে যে, যদি কেউ কোন দস্তরখানা’য় ‘আহমদ’ অথবা ‘মুহাম্মদ’ লিখে রাখে, তবে ঐ স্থানে প্রতিদিন দু’বার রহমত নাযিল হয়, সুবহানাল্লাহ্!
(মুসনাদুল ফিরদাউস, হাদীস নং ৫৬৫২৫)
অতঃপর সন্দেহাতীতভাবে প্রমানীত যে, নবীজির নামে নাম রাখলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ﷺ এঁর পক্ষ থেকে বিশাল লোভনীয় ‘অফার’ রয়েছে। কিন্তু ‘অকাল কুষ্মাণ্ড’ জাতির একি দশা! পুরস্কার স্পষ্ট জান্নাত হওয়া সত্ত্বেও তারা আজ পথ হারিয়ে এ কোন বনে গিয়ে পড়লো? আর সে কোন বন থেকেই বা ’পিঙ্কু’, লিঙ্কু, কিং, ডন টাইপের অদ্ভূত নাম গুলো আবিষ্কার করলো? তারা কিভাবে আজ কুরআনুল করিমের সেই সতর্ক সংকেত ‘ওয়া লা তাত্ত্বাবিয়ু খুতুওয়া-তিশ শায়ত্বান’ ভুলে গিয়ে শয়তানের সহযোগী বনে গেলো? অচিরেই যে পাপের মহা সাইক্লোন গর্জন করে মহা বিপদ সংকেত বাজাচ্ছে, তা কী তারা দেখেও দেখছে না?

0 মন্তব্যসমূহ